Showing posts with label পাহাড় ও হ্রদ একসঙ্গে দেখ যাবে. Show all posts
Showing posts with label পাহাড় ও হ্রদ একসঙ্গে দেখ যাবে. Show all posts

Wednesday, August 13, 2014

শ্রীমঙ্গল চা বাগানে

চা বাগানে নতুন বছর বৃষ্টিস্নাত হয়ে এখন নতুন রূপে সেজেছে শ্রীমঙ্গল। অনেক দিনের খরা শেষে বৃষ্টির দেখা পাওয়া গেল। চায়ের বাগানগুলো যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। পাহাড়-টিলায় নাম জানা না-জানা গাছগুলোর ডালপালা চুইয়ে পড়ছে বৃষ্টির বিন্দু। সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে বের হওয়া ঝরনাগুলোর পানি দেখেমনে হয় যেন ঢল নেমেছে। চারদিক থেকে সবুজ-সতেজ জীবনের হাতছানি। সজীবতার এ ডাক ফিরিয়ে দেয় কার সাধ্য? বছরের প্রথম দিনটিতে তো তা উপেক্ষা করতে পারলামই না।
১ বৈশাখ ১৪১৭ বঙ্গাব্দ। একদম ভোরে শ্রীমঙ্গল-শমসেরনগর সড়ক ধরে বেরিয়ে পড়লাম। শ্রীমঙ্গল শহর ছাড়িয়ে কিছু দূর এগোলেই চেখে পড়ে ঠেলাগাড়ির দীর্ঘ লাইন। একদল শ্রমজীবী মানুষ পাহাড়ি রাস্তায় দৌড়াচ্ছে আর ঠেলা ঠেলছে। কারও ঠেলায় আনারস, কারও ঠেলায় লেবু, কাঁঠাল, কলা। তাদের গন্তব্য শ্রীমঙ্গলের নতুন বাজার। ফলের পাইকারি এ বাজারটি সূর্যোদয়ের আগেই শেষ হয়ে যায়।
ডানে-বাঁয়ে চোখ ফিরিয়ে দেখলাম বৃষ্টির ছোঁয়া পেয়ে চা গাছে নতুন কুঁড়ি গজিয়েছে। বাতাসে কাঁচা চায়ের মিষ্টি একটা গন্ধ অনুভব করলাম। চা গাছের কচি গাঢ় সবুজ পাতায় বিন্দু বিন্দু বৃষ্টির ফোঁটা জমে আছে। একটু পরেই চা বাগানের ছায়াবৃক্ষের ফাঁকে উঁকি দেবে সূর্য।
দেখতে দেখতে পুবের আকাশ অনেকটাই রাঙা হয়ে এসেছে। তারই খানিকটা আভা এসে পড়েছে ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’র ওপর, যেখানে ফোঁটায় ফোঁটায় জমে আছে বৃষ্টির বিন্দু। তার ওপর র্সূযের আলো পড়ে জ্বল জল করছে।
প্রকৃতি আর মানুষের সৃজিত চা বাগানের রূপলাবণ্য দেখতে দেখতে চা গবেষণাকেন্দ্রের (বিটিআরআই) রাস্তায় এসে পৌঁছালাম। চৌরাস্তার পাশেই বিশাল তিন-চারটি গাছের মগডালে পাখিদের কিচির-মিচির। দেখলাম সবুজ ঘুঘুর দল একে অপরের সঙ্গে মিতালি করছে।

ভোরের আলোয় হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম জেমস ফিনলে টি কোম্পানির কাকিয়াছড়া চা বাগানে। বাগানের লাইন (সারিবদ্ধ শ্রমিক বসতি) থেকে ভেসে আসছে শ্রমিক সরদারের হাঁক—‘রেন্ডি দফা দুইয়ে, দোছরা দফা সাতে…’।
হাঁক অনুসরণ করে এগিয়ে গেলাম। তিন-চার দিক থেকে এমন হাঁক বাতাসে ভেসে আসছে। লম্বা লাঠি হাতে প্রতিটি শ্রমিক লাইনে সরদাররা ঘুরে ঘুরে সুর করে হাঁকছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা গেল সারিবদ্ধভাবে চা বাগানের নারী-শ্রমিকেরা কাজে যোগ দেওয়ার জন্য লাইন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। শত শত নারী-শ্রমিক ছড়িয়ে পড়লেন চা বাগানের চারদিকে—মাঠে মাঠে।
রাস্তার দুই পাশে নারী-শ্রমিকের পাতা তোলার ছন্দময় দৃশ্য দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম কাকিয়াছড়া পেরিয়ে ফুলছড়া চা বাগানে। সবখানেই একই দৃশ্য। চিরায়ত প্রাণের স্পন্দন।
রিকশা নিয়ে চা বাগানে বেড়ানোর মজাই আলাদা। ফুলছড়া চা বাগানের বাজার থেকে রিকশা নিলাম। ভাড়া প্রতি ঘণ্টায় ৬০ টাকা।
দুপুরে সূর্য যখন মাথার ওপরে। কালীঘাট চা বাগানের বিশাল বটগাছের কাছে বাজারের একটি চায়ের দোকানে বসে খানিকটা বিশ্রাম নিলাম। মুড়ি, পেঁয়াজ আর কাঁচা পাতার এক কাপ চা দিয়ে গলাটা ভিজিয়ে অবসন্ন শরীরটাকে চাঙা করে আবারও পথ ধরলাম।
কালীঘাট পেরিয়ে ডিনস্টন চা বাগান। এ বাগানের বহুল পরিচিত নাম কেজুরিছড়া। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। কেজুরিছড়া চা বাগানে রয়েছে ‘ডিনস্টন সিমেট্রি’। খ্রিষ্টানদের এই কবরস্থানের সঙ্গে এ অঞ্চলে চা বাগানের গোড়াপত্তনের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। তাই চা বাগান কর্তৃপক্ষ এ কবরস্থানটিকে খুবই যত্ন করে রেখেছে।
১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে শ্রীমঙ্গলে চায়ের আবাদ শুরু হয়। সে সময় থেকে ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত যেসব ব্রিটিশ সাহেব-মেম এবং তাঁদের শিশুরা মারা গেছেন, তাঁদের এখানে সমাহিত করা হয়েছে।
সিমেট্রি থেকে যখন ফিরছিলাম তখন পড়ন্ত বিকেল। শ্রমিকেরা মাঠ থেকে ফিরছেন। মাথায় তাঁদের কাঁচা পাতার বোঝা। সারিবদ্ধ এই ফেরা আরও একটা নির্দিষ্ট গন্তব্যে, যেখানে একজন বাবু (করণিক) পাতার ওজন মেপে নামের পাশে লিখে রাখবেন। ওখানে পাতা বুঝিয়ে দিয়ে তবে নারী-শ্রমিকেরা বাড়ি ফিরবেন।
ফিরতি পথে চা বাগানে সূর্যাস্ত উপভোগ করলাম। আস্তে আস্তে চা বাগানের ছায়াবৃক্ষের ফাঁক দিয়ে সূর্য ডুবছে। একসময় টকটকে লাল সূর্যপিণ্ড দিগন্ত বিস্তৃত সমান্তরাল চা গাছের আড়ালেই যেন হারিয়ে গেল। গাঢ় সবুজের মধ্যে লাল বৃত্ত। আমাদের পতাকাকেই যেন স্মরণ করিয়ে দেয়।
চা বাগানে সবুজের মধ্যে শেষ হলো বাংলা বছরের প্রথম দিনটি। সারা বছর যদি এভাবেই কাটত!
কোথায় থাকবেন কীভাবে থাকবেন

শ্রীমঙ্গলের চা বাগানে বেড়াতে হলে সবচেয়ে ভালো থাকার ব্যবস্থা রয়েছে চা গবেষণা কেন্দ্র ও প্রকল্প উন্নয়ন ইউনিটের দুটি রেস্ট হাউস। আর আছে চা বোর্ডের টি রিসোর্ট। এ তিনটিই চা বাগানের মধ্যে। এ ছাড়া শ্রীমঙ্গল শহরে থাকার ভালো আবাসিক হোটেল রয়েছে। আছে গেস্ট হাউস। ৫০০-৬৫০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়ায় এসব আবাসিক হোটেল, রেস্ট হাউস, গেস্ট হাউস পাওয়া যাবে। তবে মনে রাখবেন, ভ্রমণের অন্তত এক সপ্তাহ আগে থাকার জায়গার ব্যবস্থা করে নিতে হবে। আর আগেই বলেছি, রিকশা নিয়ে চা বাগানে ঘোরার মজাই আলাদা। ৬০ টাকা ঘণ্টা হিসেবে রিকশা ভাড়া পাওয়া যায়। এ ছাড়া শহরের পেট্রলপাম্প মোড়ে কার-মাইক্রোবাস ভাড়া পাওয়া যায়। সারা দিনের জন্য দূরত্ব বিশেষে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা ভাড়া দিতে হবে।

Monday, August 11, 2014

কপোতাক্ষের বাঁকে বাঁকে

কার কাছে যেন শুনেছিলাম গল্পটা। এক আগন্তুক বাংলার কোনো এক গাঁয়ে গিয়ে এক লোকের কাছে জানতে চাইলেন, এখানে কপোতাক্ষ নদ কোথায়। লোকটি আগন্তুককে বললেন, যে নদীতে দেখবেন কোনো পালতোলা নৌকা চলে না, ধরে নেবেন সেটাই কপোতাক্ষ নদ।’
কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত সেই নদ দেখব, এমন আশা অনেক দিনের।
‘সতত হে নদ, তুমি পড় মোর মনে।
সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে।’
কবির লেখা এ লাইন দুটো যেন মনে গেঁথে ছিল। হঠাৎ করেই সুযোগ জুটে গেল। সিইজিআইএস থেকে পরিবেশ গবেষণার কাজে যেতে হয়েছিল যশোর। আর বেশ কটা দিন পথ চলতে হয়েছিল সেই কপোতাক্ষের বাঁকে বাঁকে। সে কথাই লিখছি।
যশোর নেমে যাত্রা করলাম গঙ্গানন্দপুর গ্রামের উদ্দেশে। গ্রামের ভেতর পায়ে হেঁটে ২০ গজ এ গানোর পরই প্রথমে কপোতাক্ষ নদের সঙ্গে দেখা। নদীতে কচুরিপানা থাকে জানি, কিন্তু কপোতাক্ষ নদে কচুরিপানা দেখে মনে হলো এত কচুরিপানা দেশের অন্য কোনো নদীতে নেই। পালতোলা নৌকা চলবে কী করে? নদের পানি শান্ত ও স্থির। এক বৃদ্ধ তালের ডোঙায় বসে আছেন মাছ ধরার জন্য। নদের দুই পাড়েই সবুজের সমারোহ। কয়েকটা জলমোরগ ঘোরাফেরা করছে। মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে কচুরির বনে। পাখির ছবি তুলতে দেখে গাঁয়ের এক ছেলে আমাকে দুর্গাটুনটুনির বাসা দেখাতে নিয়ে গেল।

এবার পৌঁছলাম ঝিকরগাছা। যশোর রোড়ের বিখ্যাত সেই সব রেইনট্রির সারি প্রথমে চোখে পড়বে এখানে। ঝিকরগাছা গিয়েও নদের সেই একই রূপ। তবে এখানে কচুরিপানা আরও বেশি।
এরপর পানিসারা হয়ে হরিহরনগর যাওয়ার পথে খেজুরগাছের সারি দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। বাংলাদেশের সব খেজুরগাছ যেন নিয়ে আসা হয়েছে যশোরের মাঠেঘাটে। গোপালগঞ্জ যেমন তালগাছের জন্য বিখ্যাত, যশোর তেমনি খেজুরগাছের জন্য। এরপর জগিখালী, ত্রিমোহনীর পথ ধরলাম। ত্রিমোহনী এসে আরেকটি নদীর সঙ্গে দেখা হলো, নাম তার বুড়িভদ্রা। বিকেল গড়িয়ে এল। পথে নীলগলা বসন্তবৌরির ডাকে মনটা আনচান করতে থাকে। বাংলাদেশের আর কোনো জেলায় এত নীলগলা বসন্তবৌরি দেখিনি। চাকলা নামের এক গ্রামে এসে দেখি রশি টানা খেয়া। নদের দুই পাড়ে খুঁটি গেড়ে এপার-ওপার রশি বেঁধে দেওয়া। নদীতে আছে নৌকা। নৌকায় দাঁড়িয়ে যদি কেউ রশি টান দেয়, তাহলে নৌকা সামনের দিকে চলে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। ফেরার পথে প্রায় ৩০টি গরুর গাড়ির দেখা মিলল। ছেলেমেয়ে, যুবক, বুড়ো সবাই মিলে বেড়াতে বের হয়েছেন। নানা রকম সাজসজ্জা, গান ও বাদ্যযন্ত্রের পসরা সাজিয়ে তাঁরা চলছেন।
পরের দিন সকালে সাগরদাঁড়ির পথ ধরি। কেশবপুর উপজেলায় এসে কিছুক্ষণ যশোরের হনুমানদের খোঁজ করি। কিন্তু এ যাত্রা তাদের দেখা মিলল না। ওরা দলবেঁধে অন্যদিকে চলে গেছে। ঘন্টাখানেকের মধ্যেই চলে আসি সাগরদাঁড়ি। কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মভিটায়। নদের ঘাটেই প্রথম যাই। ঘাটে নাও ভেড়ানো আছে। কয়েক ঝাঁক মাঝলা ও গো-বগ খাবার খুঁজে বেড়াচ্ছে। দত্তবাড়ির ঘাট থেকে একটু দূরেই কবির বাড়ি। বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সার্বিক তত্ত্বাবধানে বাড়ি ও অন্য সবকিছু সংরক্ষণ করা হয়েছে। টিকিট কেটে কবির বাড়ি ঢুকতে হবে। বেশ কিছু বড় আমগাছ আছে বাড়িটিতে। আরও আছে ঘাট বাঁধানো পুকুর। পাতিমাছরাঙা সব সময় আনাগোনা করে এ পুকুরে। বাড়ির ভেতরে আছে কবিপরিবারের ব্যবহূতসামগ্রী। যেমন—দা, আলনা, খাট, থালা, কাঠের সিন্দুক, কবির লিখিত পাণ্ডুলিপি, পারিবারিক ছবিসহ নানা কিছু।
সাগরদাঁড়ি দেখে কুমিরা, ইসলামকাঠি হয়ে আমরা তালা উপজেলায় পৌঁছালাম। পথে বেশ কিছু বিল পড়ে। শালিখা ও জালালপুর বিল এর মধ্যে অন্যতম। তালা গিয়ে কপোতাক্ষ নদে জোয়ার দেখা গেল। কিছু বড় নৌকা ছিল নদে। জোয়ারের পানিতে বেশ পলি। পলি জমে ওখানে নদ ভরাট হয়েযাচ্ছে। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পানির প্রবাহ। সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা গিয়ে দেখা গেল নদের পাশের কেওড়াগাছ মরে গেছে। নিয়মিত জোয়ার-ভাটা হলে এ গাছগুলো মারা যেত না।
কপোতাক্ষ নদের উৎপত্তি দর্শনার কাছে মাথাভাঙা নদী থেকে। এরপর চৌগাছা, ঝিকরগাছা, চাকলা, ত্রিমোহনী, জীবনগর, কোটচাঁদপুর, সাগরদাঁড়ি, তালা, কপিলমনি, বারুলী, চাঁদখালী, বড়দল, আমাদী, বেদকাশী প্রভৃতি স্থানের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সুন্দরবনের মধ্যে খোলপেটুয়া নদীর সঙ্গে মিশেছে। এখন সাগরদাঁড়ি থেকে কপিলমনিয়া পর্যন্ত হাঁটু কিংবা কোমর অবধি পানি। নিয়মিত জোয়ার-ভাটা নেই বলে স্রোতও নেই। ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে কপোতাক্ষের সঙ্গে গঙ্গা নদীর মূল স্রোতধারা বন্ধ হয়ে গেছে। কেবল বর্ষার সময় নদীতে অল্প পরিমাণ পানি আসে। এখন একমাত্র বর্ষার পানিই কপোতাক্ষের পানির প্রধান উৎস। কথিত আছে, কপোতের অক্ষের (কবুতরের চোখ) মতো স্বচ্ছ পানি বলে এ নদের নাম হয়েছিল কপোতাক্ষ। কিন্তু কপোতাক্ষের পানি আজ ঘোলা। এলাকাবাসীর অভিমত, ঠিকভাবে খনন করা হলে আবার কিছুটা হলেও সজিব হয়ে উঠবে কপোতাক্ষ। সেদিন হয়তো একটি পালতোলা নৌকার

দেখা পাবেন সেই আগন্তুক।
কীভাবে যাবেন ও কোথায় থাকবেন
সাগরদাঁড়িতে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ি যেতে চাইলে প্রথমে যেতে হবে যশোর। এরপর যশোর শহর থেকে বাসে করে কেশবপুর। সেখান থেকে সিএনজি অটোরিকশা বা মাইক্রোবাসে করে সাগরদাঁড়ি যেতে হবে।
যশোর শহর থেকে সাগরদাঁড়ি পর্যন্ত প্রায় দু্ই-আড়াই ঘণ্টা পথ। দত্তবাড়ির কাছেই আছে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের রেস্টহাউস। সেখানে থাকতে পারেন অথবা থাকতে পারেন কেশবপুর উপজেলা ডাকবাংলোতে। তবে আগে থেকেই কথা বলে রাখতে হবে।

মানিকগঞ্জ বেড়ানো

ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা মানিকগঞ্জ। এর উত্তরে টাঙ্গাইল জেলা, দক্ষিণে ফরিদপুর ও ঢাকা জেলা, পূর্বে ঢাকা জেলা এবং পশ্চিমে পাবনা ও রাজবাড়ী জেলা অবস্থিত। পদ্মা, যমুনা, ধলেশ্বরী, ইছামতি, কালিগঙ্গা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ নদী এ জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে। জেলার বিভিন্ন স্থানে বেড়ানোর তথ্য নিয়ে এবারের বেড়ানো।
বালিয়াটি জমিদার বাড়ি
সুরম্য এ জমিদার বাড়িটি জেলার সাঁটুরিয়ায় অবস্থিত। বালিয়াটির জমিদাররা আঠারো শতকের প্রথম ভাগ থেকে বিশ শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত প্রায় দু’শ বছর নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা তৈরি করেন। আঠারো শতকের মধ্যভাগে জনৈক লবণ ব্যবসায়ী জমিদার গোবিন্দরাম শাহ বালিয়াটি জমিদারবাড়ি নির্মাণ করেন। আর ক্রমান্বয়ে তার উত্তরাধিকারীরা এখানে নির্মাণ করেন আরো বেশ কটি স্থাপনা। এখানে পূর্ববাড়ি, পশ্চিমবাড়ি, উত্তরবাড়ি, মধ্যবাড়ি এবং গোলাবড়ি নামে পাঁচটি ভবন ছিল। আর জমিদারবাড়ির এ বিভিন্ন অংশ বালিয়াটি জমিদার পরিবারের বিভিন্ন উত্তরাধিকারী কর্তৃক তৈরি হয়েছিল। মূল প্রসাদ কমপ্লেক্সটি একই রকম পাঁচটি অংশ পৃথকভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে পূর্বের অংশটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেলেও বাকি চারটি টিকে আছে এখনও। মূল ভবনগুলোর সম্মুখভাগে নানারকম কারুকাজ আজ মূর্তি এখনও বিদ্যমান।
বালিয়াটি জমিদারবাড়ির বিশাল কমপ্লেক্সটি উঁচু দেয়ালে চারদিক ঘেরা। এখনও টিকে রয়েছে সেই দেয়াল। এ দেয়ালের মাঝে এখন রয়েছে চারটি সুদৃশ্য ভবন। আর ভবনগুলোর সামনের বেষ্টনী দেয়ালে রয়েছে চারটি প্রবেশ পথ। চারটি ভবনের পেছন দিকে রয়েছে আরো চারটি ভবন। চারটি প্রবেশ পথের চূড়ায় রয়েছে পাথরের তৈরি চারটি সিংহমূর্তি।
রাম কৃষ্ণ মিশন
বালিয়াটি জমিদার বাড়ির পাশেই রয়েছে রাম কৃষ্ণ মিশন। ১৯১০ সালে বালিয়াটিতে শ্রী রাধিকা চরণ চৌধুরি রাম কৃষ্ণ মিশন দেবাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। এ দেবাশ্রমে একটি উপসনালয় এবং একটি গ্রন্থাগার আছে। ভারতের কেন্দ্রীয় রাম কৃষ্ণ মিশন কর্তৃক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বাংলাদেশের দশটি মিশনের মধ্যে এটি অন্যতম একটি ।
গৌরাঙ্গ মঠ

রামকৃষ্ণ মিশনের সামনে রয়েছে বিখ্যাত গৌরাঙ্গ মঠ। জমিদার মনমোহন রায় চৌধুরি ১৯২৫ সালে তার সহধর্মিনী ইন্দুবালা এবং কন্যা সুনীতিবালার স্মৃতির উদ্যেশ্যে ভারতের বিখ্যাত গদাই গৌরাঙ্গ মঠের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এ শাখা মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। মঠটির ভেতরে গদাই গৌরাঙ্গ মূর্তিটি এখন আর মন্দিরে নেই। ৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় পাক হানাদার বাহিনী পাথরের তৈরি মূর্তিটি ধ্বংস করে ফেলে।
ঈশ্বরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়
বালিয়াটি জমিদার বাড়ির কাছেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হলো ঈশ্বরচন্দ্র উচ্চ বিদাালয়। বালিয়াটির অন্যতম জমিদার ঈশ্বরচন্দ্র রায়ের নামানুসারে এ স্কুলের নামকরণ করা হয়েছে। ১৯১৫-১৬ সালে ঈশ্বরচন্দ্রের পুত্র হরেন্দ্র কমুার রায় চৌধুরী স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। হরেন্দ্র কুমার তৎকালীন সময়ে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা ব্যয় করে স্কুলটির পাকা ভবন নির্মাণ করেছিলেন।
তেওতা জমিদার বাড়ি
জেলার শিবালয় উপজেলায় অবস্থিত প্রাচীন জমিদার বাড়ি। বাবু হেমশংকর রায় চৌধুরী এবং জয়শংকর রায় চৌধুরী নামে দুই জমিদার ভাই সুরম্য এ বাড়িটিতে থেকে জমদিারি পরিচালনা করতেন। বর্তমানে এটি ধ্বংসের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছে। ভগ্নপ্রায় ৫৫ টি কক্ষ এখনও এ বাড়িটিতে অবশিষ্ট আছে।
শ্রী আনন্দময়ী কালীবাড়ি
মানিকগঞ্জ শহরে অবস্থিত ১৮৯৫-৯৬ সালে নির্মিত শ্রী আনন্দময়ী কালীবাড়ি। এ মন্দিরে শ্রী আনন্দময়ী কালী মায়ের প্রস্তর মূর্তি আছে। প্রতি বছর রথ উপলক্ষে এখানে লোকজ মেলা বসে। এছাড়া এখানে নিয়মিত ধর্মসভা, নামকীর্তন, যাত্রাপালাসহ নানা অনুষ্ঠান হয়ে থাকে।
মাচাইন মসজিদ ও মাজার
সুলতানি আমলের প্রাচীন একটি স্থাপনা মাচাইন মসজিদ। এটি জেলার মাচাইন গ্রামের নামে এর নামকরণ হয়েছে। জনশ্রুতি আছে এখানে শাহ রুস্তুম নামে একজন দরবেশ বাঁশের মাচায় বসে ধ্যান মগ্ন থাকতেন। মসজিদের পাশেই এ দরবেশের মাজার অবস্থিত।
আরিচা ঘাট ও যমুনা

মানিকগঞ্জের একসময়ের ব্যস্ত জনপদ আরিচা ঘাট। ফেরি ঘাট অন্যত্র স্থানান্তরের কারণে এখন এর ব্যস্ততা অনেক কমে এসেছে। এ জায়গা থেকে যমুনার সৌন্দর্যও বেশ সুন্দর। এখানে যমুনার চরে নৌ ভ্রমণও বেশ আনন্দদায়ক।
কীভাবে যাবেন
ঢাকার গুলিস্তান থেকে শুভযাত্রা, বিআরটিসি পরিবহন, গাবতলী থেকে যাত্রীসেবা, পদ্মা লাইন, নবীন বরণ, ভিলেজ লাইন, জনসেবা পরিবহন, বাবু বাজার থেকে ছালছাাবিল, শুকতারা পরিবহনে চড়ে যাওয়া যায় মানিকগঞ্জ সদরে। ভাড়া ৪০-৫০ টাকা। ঢাকা থেকে বালিয়াটি জমিদার বাড়ি ও এর আশপাশের জায়গাগুলো দেখার জন্য এসব বাসে চড়ে কালামপুর নেমে সেখান থেকে লোকাল বাসে সাঁটুরিয়া আসা যায়। মানিকগঞ্জ শহর থেকেও সাঁটুরিয়ার বাস আছে। ভাড়া ১৫ টাকা।
কোথায় থাকবেন
ঢাকা থেকে দিনে দিনেই বেরিয়ে আসা যায় মানিকগঞ্জ। আর থাকার জন্য ভালো মানের কোন হোটেলও নেই এখানে। একান্ত জরুরি থাকতে হলে সাধারণ মানের দু’একটি হোটেলের ঠিকানা হেয়া হলো। শহরের শহীদ রফিক সড়কে হোটেল, মানিকগঞ্জ আবাসিক বোর্ডিং, ফোন- ০৬৫১-৬১৩৫৯। মানিকগঞ্জ বাস স্টেশনে হোটেল নবীন, ফোন- ০১৭১২৬১১৪৫২। এসব হোটেলের প্রতিদিনের ভাড়া এক শয্যার কক্ষ ৫০-১০০ টাকা, দ্বি-শয্যার কক্ষ ১০০-১৫০ টাকা।

কুয়াকাটার ফাতরার বন

আমাদের দেশে ঘুরে দেখার মতো অনেক পরিচিত জায়গা আছে। আবার এমন কিছু জায়গা আছে, যেগুলো কম পরিচিত হলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। এমনই একটি জায়গা হলো কুয়াকাটার কাছে ফাতরার বন।
কুয়াকাটা যান অনেকেই। কিন্তু এর কাছেই ফাতরার বনে অনেকেই যায় না। ওই বনে যাওয়ার জন্য অবশ্য খুব নিরাপদ ব্যবস্থা না থাকাটাও অবশ্য একটা কারণ। মাসখানেক আগে সাত বন্ধু মিলে কুয়াকাটা বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেখানে একদিন কাটিয়ে পরদিন তথ্য সংগ্রহ করে সকাল নয়টায় ফাতরার বনের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলাম। কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত থেকে ছোট্ট একটা ট্রলারে করে শুরু হয় আমাদের সমুদ্রযাত্রা। ছিল ভয় পাওয়ার মতো যথেষ্ট উত্তাল ঢেউ। তাতেই বোঝা যায়, কেন খুব একটা পর্যটকদের আনাগোনা নেই এ পথে। এ পথে যেতে একটু রোমাঞ্চপ্রিয় হতে হয়। এক থেকে দেড় ঘণ্টা ট্রলারে টানা চলার পর চোখে পড়ল সাত-আট কিলোমিটার বিস্তৃত সারি সারি গাছ আর ঘন বনজঙ্গল। দূর থেকে মনে হলো একটা সবুজ বনের দ্বীপ। শেষে ট্রলারটি বনের কোলঘেঁষে একটা খালে ঢুকল। এই খালটিই বনের গভীরে চলে গেছে। খালের মধ্য দিয়ে কিছু দূর এগোনোর পর ট্রলারটি ছোট জেটির মতো এক জায়গায় থামল। প্রথমে মনে হচ্ছিল, সুন্দরবনের কোনো খাল পার হচ্ছি। একে একে সবাই নামলাম ট্রলার থেকে। নেমেই দেখা গেল, বনের মধ্যে সাজানো-গোছানো একটি পুকুর। এর পাশে বাংলোর মতো একটা বাড়ি। আর আশপাশে দু-একজন মানুষ। জিজ্ঞেস করতেই তাঁরা বললেন, এটা আমতলী ফরেস্ট রেঞ্জের বাংলো। এই বনের মাঝেমধ্যে জেলেরা মাছ ধরতে আসে। এ ছাড়া মানুষ বা কোনো বন্যপ্রাণীর আনাগোনাও নেই। চারদিকে শুধুই ঘন বন। প্রায় ঘণ্টাখানেক ঘন বনের মধ্যে ঘুরেফিরে বেরিয়ে আবার ট্রলারে চড়লাম। ট্রলারের চালককে খালের মধ্য দিয়ে বনের আরো গভীর যেতে বললাম। চারদিকে এত ঘন জঙ্গলে ভরা ভাবতেই পরিনি। চারদিকে নিস্তব্ধতা শুধু। মোট ঘণ্টা দুয়েক থেকে আবার ফেরার পধ ধরলাম নদী হয়ে সমুদ্রপাড় ঘেঁষে।

যাবেন কীভাবে
ঢাকা থেকে সড়কপথে কুয়াকাটা যাওয়া যায়। গাবতলী থেকে বাস ছাড়ে। কুয়াকাটায় থাকার জন্য বন বিভাগের রেস্টহাউস ও বেসরকারি হোস্টেল রয়েছে। কুয়াকাটা থেকে ট্রলারে করে ফাতরার বনে যেতে পারেন।

Saturday, August 9, 2014

মুন্সিগঞ্জ ভ্রমণ

রাজধানী থেকে মাত্র ২৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত ঐতিহাসিক জনপদ মুন্সিগঞ্জ। এর উত্তরে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলা, পূর্বে কুমিল্লা ও চাঁদপুর জেলা, দক্ষিণে মাদারীপুর ও শরিয়তপুর জেলা এবং পশ্চিমে ঢাকা ও ফরিদপুর জেলা। পদ্মা, মেঘনা, ধলেশ্বরী, ইছামতি ও শীতলক্ষা এ জেলার প্রধান নদী। এ জেলার বেশিরভাগ বেড়ানোর জায়গাই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাকেন্দ্রিক। কড়চার এবারের বেড়ানো একদিনে মুন্সিগঞ্জ ভ্রমণ।
ইদ্রাকপুর দুর্গ
মুন্সীগঞ্জ শহরের ইদ্রাকপুরে অবস্থিত ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ইদ্রাকপুর দুর্গ। ইতিহাস থেকে জানা যায় মুঘল সুবাদার মীর জুমলা ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলা সদরে পুরনো ইছামতি নদীর পশ্চিম তীরের ইদ্রাকপুরে এই দুর্গটি নির্মাণ করেন। নারায়ণগঞ্জের হাজীগঞ্জ ও সোনাকান্দা দুর্গের চেয়ে এটি আয়তনে কিছুটা ছোট। সে সময় মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের আক্রমণ থেকে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জসহ অন্যান্য এলাকা রক্ষা করার জন্য নির্মিত হয়েছিল এই দুর্গটি। সুরঙ্গ পথে ঢাকার লালবাগ দুর্গের সাথে এই দুর্গের সংযোগ ছিল বলে একটি জনশ্রুতি আছে। উঁচু প্রাচীর ঘেরা এই দুর্গের চারকোণে রয়েছে একটি করে গোলাকার বেস্টনী। দুর্গের ভেতর থেকে শত্রুর প্রতি গোলা নিক্ষেপ করার জন্য চারদিকের দেয়ালের গায়ে রয়েছে অসংখ্য ছিদ্র। বাংলাদেশে মুঘল স্থাপত্যের অনন্য নির্দশন হিসেবে ইদ্রাকপুর দুর্গটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষিত হয় ১৯০৯ সালে।
রামপাল দীঘি
জেলার রামপালে অবস্থিত। বিক্রমপুরের রাজধানী রামপালের রাজা বল্লাল সেন জনগণের পানীয় কষ্ট দূর করার জন্য এই বিশাল দীঘিটি খনন করেন। কিংবদন্তি আছে, বল্লাল সেনের মা প্রজাদের পানীয় জলের কষ্ট দূর করতে তাকে একটি দীঘি খনন করার আদেশ দেন। বল্লাল সেন মাকে আশ্বাস দেন, তিনি (মা) যতদূর হেঁটে যেতে পারবেন ততটুকু জায়গা নিয়ে দীঘি খনন করে দিবেন। পরের দিন সকালে তার মা দক্ষিণ দিকে হাঁটতে শুরু করেন। বল্লাল সেন দেখলেন তার মা অনেক দূর পর্যন্ত হেঁটে চলে গেছেন। তখন তার অসুস্থতার সংবাদ পাঠালে তিনি ফিরে আসেন। সেদিন বল্লাল সেনের মা যতদূর পর্যন্ত হেঁটে গিয়েছিলেন ততটুকু দীর্ঘ দীঘি খনন করেন বল্লাল সেন।
বল্লালবাড়ি
রামপাল দীঘির উত্তর পাশে অবস্থিত বল্লাল সেনের বাড়ি। এখানে ছিল বল্লাল সেনের রাজপ্রাসাদ ও একটি পরিখা। বর্তমানে পরিখার চিহ্ন থাকলেও রাজপ্রাসাদটি ধ্বংস হয়ে গেছে।
বাবা আদম শহীদ মসজিদ
জেলার রামপালের রেকাবি বাজার ইউনিয়নের কাজী কসবা গ্রামে অবস্থিত বাবা আদম শহীদ মসজিদ। এর কেন্দ্রীয় প্রবেশপথের উপরের একটি শিলালিপি থেকে জানা যায়, সুলতান ফতেহ শাহ’র শাসনামলে, ১৪৮৩ সালে মালিক কাফুর মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদটির বাইরের দিকের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ যথাক্রমে ১০.৩৫ মিটার ও ৩.৭৫ মিটার। এর দেয়াল প্রায় ২ মিটার পুরু। মসজিদের উপরে দুই সারিতে ছয়টি গম্বুজ আছে। মসজিদের পাশেই আছে বাবা আদমের সমাধি। জনশ্রুতি আছে, বল্লাল সেনের রাজত্বকালে বাবা আদম নামে একজন ব্যক্তি ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এ অঞ্চলে আসেন। বল্লাল সেনের নির্দেশে বাবা আদমকে হত্যা করা হলে তাকে এখানে সমাহিত করা হয়।
মীরকাদিম পুল
মুন্সিগঞ্জ শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে মীরকাদিম খালের ওপর নির্মিত মুঘল আমলের পুল। প্রায় ৫২.৪২ মিটার দৈর্ঘ্যের এ পুলটি বেশ কয়েকবার সংস্কারের ফলে এর পুরনো রূপ এখন আর নেই। চুন-সুরকিতে তৈরি এ পুলটির সঠিক নির্মাণকাল জানা যায়নি।
পণ্ডিতের ভিটা
সদর উপজেলার বজ্রজোগিনী ইউনিয়নের সোমপাড়ায় অবস্থিত শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্করের বসতভিটা। বর্তমানে এখানে থাই স্থাপত্য রীতিতে তৈরি একটি স্মৃতিসৌধ বর্তমান।
শ্যাম শিদ্ধির মঠ
জেলার শ্রীনগর উপজেলার শ্রীনগর বাজারের পশ্চিম দিকে শ্যামসিদ্ধি গ্রামে অবস্থিত এ মঠ। মঠটির দক্ষিণ দিকের প্রবেশপথের উপরের বাংলা শিলালিপি অনুযায়ী, ১৮৩৬ সালে জনৈক শম্ভুনাথ মজুমদার এটি নির্মাণ করেন। ইট নির্মিত বর্গাকোর এ মঠের দৈর্ঘ্য ৬ মিটার এবং উঁচু প্রায় ২০ মিটার।
সোনারং জোড়া মঠ
জেলার টঙ্গীবাড়ি উপজেলার সোনারং গ্রামে অবস্থিত পাশাপাশি দুটি মঠ। এর বড়টি শিবের উদ্দেশ্যে এবং ছোটটি কালীর উদ্দেশ্যে নিবেদিত। শিব মন্দিরটি ১৮৪৩ সালে এবং কালী মন্দিরটি ১৮৮৬ সালে নির্মিত। জানা যায়, রূপচন্দ্র নামক এক হিন্দু বণিক এর নির্মাতা।
পদ্মা রিজর্ট
জেলার লৌহজংয়ে পদ্মার চরের মনোরম একটি জায়গায় নির্মিত পদ্মা রিজর্ট। এখানে আছে কাঠের তৈরি ষোলোটি কটেজ। পদ্মা নদীর সৌন্দর্য উপভোগের সঙ্গে সঙ্গে থাকা-খাওয়ারও সুব্যবস্থা আছে। এখানকার রেস্তোরাঁটির খাবার মানও ভালো। কটেজে অবস্থান না করতে চাইলে শুধু জায়গাটি বেড়িয়ে আসা যায়। পদ্মা রিজর্টের আগাম বুকিং দেয়া যাবে এই নম্বরে ০১৭১৩০৩৩০৪৯।
কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে সড়ক ও জলপথে মুন্সিগঞ্জ জেলা সদরে আসা যায়। ঢাকার গুলিস্তান ও বঙ্গভবনের দক্ষিণ পাশ থেকে নয়ন পরিবহন, ঢাকা ট্রান্সপোর্ট ছাড়াও বেশ কিছু বাস মুন্সিগঞ্জ যায়। ভাড়া ৩০-৪০ টাকা। এছাড়া ঢাকার সদরঘাট থেকে ছোট ছোট কিছু লঞ্চ, চাঁদপুরগামী সব বড় লঞ্চই মুন্সিগঞ্জ কাঠপট্টি স্টেশনে থামে। ভাড়া ১৫-২০ টাকা।
কোথায় থাকবেন
ঢাকা থেকে দিনে দিনে মুন্সিগঞ্জ ভ্রমণ শেষ করে ফিরে আসা সম্ভব। তাছাড়া জেলাশহরে থাকার সাধারণ মানের কিছু হোটেল আছে। শহরের দু-একটি হোটেল হলো- হোটেল থ্রি স্টার (০১৭১৫৬৬৫৮২৯, ০১৭১৫১৭৭৭১৬) এবং হোটেল কমফোর্ট। এসব হোটেল ১৫০-৬০০ টাকায় থাকার ব্যবস্থা আছে। ভ্রমণে গেলে মুন্সিগঞ্জের জায়গাগুলো দেখে সবশেষে পদ্মা রিজর্টে (০১৭১৩০৩৩০৪৯) এসে থাকলে ভালো লাগবে।

পাহাড় ও হ্রদ একসঙ্গে দেখ যাবে

বাংলাদেশে পাহাড় ও হ্রদ একসঙ্গে দেখ যাবে—এ রকম জায়গা খুব কম, এর মধ্যে রাঙামাটি একটি। আগে রাঙামটি ঘুরে দেখলেও পাহাড়ি গ্রাম বা আদিবাসীদের জীবনযাত্রার পরিচয় পাইনি। আমরা কয়েকজন বন্ধু লোকালয় থেকে একটু দূরে এমন কোনো জায়গায় যাওয়ার পরিকল্পনা করলাম, কোথায় যাব ভাবছি। এ সময় রাঙামাটির বিলাইছড়ি থেকে এক বন্ধুর দাওয়াত পেয়ে হাতে যেন চাঁদ পেলাম।
আমরা সাত বন্ধু- দুই জোড়া দম্পতি ও তিনজন ব্যাচেলর বিলাইছড়ি রওনা দিলাম। রাতে সরাসরি কাপ্তাইয়ের বাসে রওনা দিয়ে সকাল আটটার মধ্যে সেখানে পৌঁছে গেলাম। খবর নিয়ে জানা গেল, সাড়ে নয়টায় বিলাইছড়ির ট্রলার যাত্রা শুরু করবে, এরপর প্রতি ঘণ্টায় ট্রলার আছে। আমরা প্রথম ট্রলারেই রওনা দিয়ে ১১টার দিকে পৌঁছে গেলাম বিলাইছড়ি।
এখানে রাস্তা তেমন নেই। এক পাড়া থেকে আরেক পাড়া ঘুরতে গেলেও নৌকা লাগে, তবে এখন কয়েকটি সেতু হয়েছে। আমরা নৌকা নিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের গাইড হলো স্থানীয় একজন চাকমা। জানা গেল, বিলাইছড়ি উপজেলার নাম হয়েছে একই নামের ঝরনা থেকে। ছড়ি অর্থ ঝরনা আর বিলাই মানে স্থানীয় ভাষায় বাঘ। অনেক আগে প্রথম লোকবসতি শুরুর সময় এখানে ছড়ি থেকে পানি আনতে গিয়ে এক পাহাড়ি বধূ বাঘের সামনে পড়ে যায়, তখন থেকে ওই ঝরনার নাম হয়ে যায় বিলাইছড়ি এবং সংলগ্ন লোকালয় একই নামে পরিচিত হয়ে যায়। ‘তবে এখন সেই রামও নাই এবং অযোধ্যাও নাই’-এর মতো এখানে কোনো বাঘ নেই। তবে এখনো ওই ঝরনা বা ছড়ি দেখা যায়।
কাপ্তাই হ্রদ ঘেঁষে পাহাড়, নদী, জঙ্গল ও হ্রদ নিয়ে সুন্দর একটি উপজেলা বিলাইছড়ি। অপ্রতুল যোগাযোগব্যবস্থা, তেমন প্রচার না হওয়ায় এই এলাকা এখনো লোকজনের পদচারণে মুখর হয়ে ওঠেনি। গাড়ির হর্ন, কোলাহল ও নাগরিক জীবনের অপ্রিয় কিন্তু এড়ানো সম্ভব নয়,—এ ধরনের সব জিনিস এখানে এসে ভুলে থাকা যায়। অলস ঘুঘুডাকা দুপুর এখনো পাওয়া যায়। এখানে দেখার মতো প্যাগোডা, কমলা বাগান, পাহাড়, নদী, হ্রদ আছে। তবে এখানকার সহজ-সরল আদিবাসীদের সঙ্গে না ঘুরলে বা কথা না বললে ভ্রমণ অপূর্ণ থেকে যাবে।
বিলাইছড়িতে গেলে বাজার অবশ্যই ঘুরবেন, আদিবাসীদের নানা রকম পাহাড়ি বনজ ও অপ্রচলিত খাবার, যেমন—আদা ফুল, হলুদ ফুল, বাঁশের খোড়ল, শামুকসহ নানা রকম পাহাড়ি ঢেঁকিশাক দেখতে পাবেন। তবে সবজি দেখতে সুন্দর হলেই যে খেতে ভালো হবে, এই ধারণা নিয়ে বাজারে গেলে এবং আগে এ ধরনের খাবার না খেলে কিঞ্চিত অসুুবিধায় পড়তে হতে পারে। আমাদের সহযাত্রী মেয়েরা এই সুন্দর ফুল দেখেই কিনে ফেলল এবং খাওয়ার তোড়জোড় শুরু করে দিল। কিন্তু একবার মুখে দেওয়ার পর মনে হলো, ফুল হাতে এবং চুলেই ভালো, রান্নাঘরে বা খাবার প্লেটে নয়।
বিলাইছড়িতে খাবারের খুব ভালো ব্যবস্থা নেই। তাই নিজেরা বাজার করে হোটেল থেকে রান্না করিয়ে নেওয়াই ভালো। কাপ্তাই লেকের মাছ না খেলে ভ্রমণের মজা অন্তত বারোআনাই মাটি। আমরা মাছ ধরার চেষ্টাও চালিয়েছি ধার করা বড়শি দিয়ে, কিন্তু ভাগ্য বিরূপ। কাঁকড়াও পেলাম না, শেষ পর্যন্ত বাজারই ভরসা।
বিলাইছড়িতে গেলে প্রথমেই ঘোরা উচিত ভিন্ন উপজাতিদের পাড়াগুলো। প্রতিটি উপজাতির আছে আলাদা ঐতিহ্য, আলাদা কাহিনি। এ ছাড়া কমলা বাগান, কাজুবাদামের বাগান ঘুরে দেখা যায়। তবে কাপ্তাই হূদ ও নদী অবশ্যই সময় নিয়ে দেখা উচিত। এ জন্য নৌকা নিয়ে ভ্রমণ করা যায়।

এ ছাড়া আশপাশের বেশ কিছু লোকালয় আছে, যেগুলো দিনেই ঘুরে আসা যায়। কিছুটা দূরে ফারুয়া বাজার আছে, পুরো দিন হাতে থাকলে সকালে বেরিয়ে বিকেলে চলে আসা যায়। এ ছাড়া আরও কিছু নাম না জানা পাহাড় আছে। বিলাইছড়ির পাহাড় কাপ্তাই বাঁধের অংশ হিসেবে কাজ করে। তাই মূল রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় এক পাশে গভীর গিরিখাদ, অপর পাশে পানিভরা হ্রদ চোখে পড়ে। এটাও দেখা উচিত হ্রদের গভীরতা বোঝার জন্য।
এই মৌসুমে যাওয়ার আগে অবশ্যই রোদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য টুপি নিয়ে যেতে হবে। সাঁতার কাটার ইচ্ছা থাকলে কাপড় নিতে হবে। আর টর্চলাইট নিতে ভুলবেন না। কারণ, বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার মধ্যেই থাকতে হবে।
কীভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন
বিলাইছড়ি যাওয়ার আগে সেখানে থাকার ব্যবস্থা করে যাওয়া উচিত। বিলাইছড়ি বাজারে কাঠের দোতলা হোটেল আছে, যদিও থাকার জন্য খুব একটা ভালো বলা যাবে না। এ ছাড়া উপজেলা অফিসের একটি বাংলো আছে, যেখানে আগে থেকে অনুমতি নিয়ে গেলে ভালো হয়। হোটেলের ভাড়া খুবই কম।
ঢাকা থেকে বিলাইছড়িতে যেতে হলে সরাসরি বাসে কাপ্তাই গিয়ে, সেখান থেকে ট্রলারে বিলাইছড়ি যাওয়া যায়। দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় লাগবে। আবার সরাসরি রাঙামাটি বাসে গিয়ে, সেখান থেকে ট্রলারে দুই-আড়াই ঘণ্টা ভ্রমণ করে বিলাইছড়ি পৌঁছা যায়। ট্রলার ভাড়া ৫০ থেকে ১০০ টাকা প্রতিজনের জন্য। আর পুরো ট্রলার ভাড়া নিতে মোটামুটি ৫০০-৬০০ টাকা লাগবে। ঢাকা থেকে সরাসরি রাঙামাটি যায় এমন বাস আছে—এস আলম, ডলফিন, শান্তিসহ বেশ কিছু পরিবহন সংস্থার।